বায়েজিদ জোয়ার্দার চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধিঃ Smtv Media
চুয়াডাঙ্গা সদর ডিঙ্গেদহ বাজার টাকা পাওনা নিয়ে সালিশের প্রস্তুতি কালে প্রতিপক্ষের আঘাতে আলিমদ্দীন নিহত। অদ্য ৮ মে ২০২৬ ইং চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার ডিঙ্গেদহে, শংকরচন্দ্র ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সুজন আলীর বাড়ির নিচতলার অফিসে বসেছিল একটি সালিশ। উদ্দেশ্য ছিল পাওনা টাকা নিয়ে বিরোধ মেটানো। কিন্তু সেই সালিশই শেষ পর্যন্ত কেড়ে নিল এক মানুষের প্রাণ। ঘটনার পর থেকেই বিভিন্ন সূত্রে খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করছিলাম-কেন এমন হলো? কীভাবে একটি টাকার বিরোধ এত ভয়াবহ পরিণতিতে গিয়ে দাঁড়াল? রাত যত গভীর হয়েছে, ততই যেন বেরিয়ে এসেছে ঘটনার ভেতরের স্তরগুলো। আর সেই স্তরের কেন্দ্রে রয়েছে অনলাইন জুয়া, কিংবা বিদেশি ট্রেডিংয়ের নামে চলা তথাকথিত “হায় হায় কোম্পানি” জানা গেছে, নিহত আলিমুদ্দি বিপুল পরিমাণ টাকা ধার দিয়েছিলেন একটি সিন্ডিকেটের কাছে। তারা বিদেশি ট্রেডিং, অ্যাপভিত্তিক বিনিয়োগ আর অস্বাভাবিক লাভের প্রলোভন দেখিয়ে মানুষের কাছ থেকে টাকা তুলত। প্রতি লাখে ২৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা লাভের আশ্বাস দেওয়া হতো। সুদে-আসলে সেই টাকার পরিমাণ একসময় গিয়ে দাঁড়ায় প্রায় ৪০ লাখ টাকায়। এই টাকা নিয়েছিলেন আরিফ-লিয়াকতের ছেলে। যিনি এখন পলাতক। অভিযোগ আছে, গ্রামের আরও অনেক মানুষের কাছ থেকেও লাখ লাখ টাকা ধার নিয়ে উধাও হয়ে যায় সে। গত বছর দেড়েক আগে চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার তিতুদহ, শংকরচন্দ্র, হিজলগাড়ি এলাকায় এক রাতে কোটি কোটি টাকা গায়েব হয়ে যায় একটি “হায় হায় কোম্পানির” পতনে। নাম ছিল সম্ভবত MTFE। মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে বিদেশি ট্রেডিংয়ের নামে বিনিয়োগ নেওয়া হতো। সন্ধ্যা পর্যন্ত অ্যাপ চালু, আর রাতেই সব উধাও। অ্যাপ নেই, টাকা নেই।
আরিফ ছিল সেই সিন্ডিকেটেরই একজন। তার সঙ্গে আরও কয়েকজন যুবক জড়িত ছিল। আজ তাদের অনেকেই নিঃস্ব। আলিমুদ্দিসহ বহু মানুষ তাদের হাতে টাকা তুলে দিয়েছিলেন লাভের আশায়। কিন্তু অনলাইন জুয়ার মতো অনিশ্চিত জায়গায় ঢোকা টাকা কি আর সহজে ফেরত আসে? সব হারিয়ে আরিফ প্রায় বছরখানেক আগে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যায়। এরপর তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দেখাশোনা করতেন বাবা লিয়াকত ও আরিফের নাবালক ছেলে। নিজের পাওনা টাকা উদ্ধারে দীর্ঘদিন ধরেই চেষ্টা করছিলেন আলিমুদ্দি। আত্মীয়-স্বজনও একাধিকবার দেনদরবার করেছেন লিয়াকতের সঙ্গে। সেই বিরোধের জের ধরেই শুক্রবার রাতে বসা হয় সুজন চেয়ারম্যানের বাড়িতে। কথাকাটাকাটি হয়। এরপর ধাক্কাধাক্কি, হাতাহাতি, কিল-ঘুষি। আর একপর্যায়ে প্রাণ হারান আলিমুদ্দি। এই তথাকথিত “হায় হায় কোম্পানি” নিয়ে কতবার সতর্ক রিপোর্ট করেছি। চুয়াডাঙ্গা শহরের সেন্ট এফ এক্স থেকে শুরু করে এমন যত প্রতারণামূলক চক্র গড়ে উঠেছে, তথ্য-প্রমাণ পেলেই সেগুলো নিয়ে লিখেছি । কিন্তু অস্বাভাবিক লাভের লোভ মানুষকে অন্ধ করে দেয়। কেউ কেউ সময়মতো সরে এসেছেন, অনেকেই পারেননি। সেন্ট এফ এক্স এখনো চালু আছে, তবে কার্যক্রম চলে গোপনে। জানা গেছে, এপ্রিলের মাঝামাঝি তারা নেপাল ট্যুরও করেছে। এই কোম্পানির মূল নাম Bullsouq- যার কোনো বৈধ রেজিস্ট্রেশনের তথ্য পাওয়া যায় না। নেপাল সফরে গিয়ে চুয়াডাঙ্গার কয়েকজন “টিম লিডার” আবার ক্রেস্টও পেয়েছেন। ডিঙ্গেদহের এই ঘটনা একদিনে তৈরি হয়নি। এটা প্রায় দুই বছরের জমে থাকা হিসাব, লোভ, প্রতারণা আর হতাশার বিস্ফোরণ। আলিমুদ্দি অল্প অল্প করে টাকা লগ্নি করতে করতে প্রায় অর্ধকোটি টাকার কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিলেন। গ্রেপ্তার হওয়া লিয়াকতের অতীত নিয়েও গ্রামে নানা আলোচনা আছে। এলাকাবাসীর দাবি, ২৫-২৬ বছর আগেও তিনি একই ধরনের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। পরে অবশ্য স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসেন।আর সুজন আলী চেয়ারম্যানের বাড়িতে যা ঘটেছে, সেটিও নিঃসন্দেহে অত্যন্ত দুঃখজনক। টাকা যেভাবেই দেওয়া হোক, যে কারণেই দেওয়া হোক- পাওনা আদায় করতে গিয়ে একটি প্রাণ চলে যাবে, এটা কখনোই কাম্য হতে পারে না। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া জরুরি। একইসঙ্গে চুয়াডাঙ্গাজুড়ে ছড়িয়ে পড়া অনলাইন জুয়া, ভুয়া ট্রেডিং আর “হায় হায় কোম্পানি”র নামে ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগ বন্ধে প্রশাসনের পাশাপাশি রাজনৈতিক নেতাদেরও সক্রিয় হওয়া দরকার। মনে রাখবেন, খুব সহজে আসা টাকার পেছনে খুব কঠিন অন্ধকার লুকিয়ে থাকে। এ সময় উপস্থিত ছিলেন প্রেস ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া অনলাইন মিডিয়ার সাংবাদিকবৃন্দরা ও প্রমুখ।


0 মন্তব্যসমূহ