পাবনায় শিক্ষা যেখানে মানুষের ভেতরের অন্ধকার দূর করে আলোর পথ দেখায়, পাবনার ঈশ্বরদীর চরকুড়ুলিয়া ‘সেলিম রেজা আদর্শ বিদ্যানিকেতন’ যেন আজ তার সম্পূর্ণ উল্টো পিঠ। যে বিদ্যাপীঠ হওয়ার কথা ছিল কোমলমতি শিশুদের নিরাপদ আশ্রয়, ক্ষমতার অপব্যবহারে তা আজ পরিণত হয়েছে এক আতঙ্কের জনপদে। আদর্শ গড়ার কারিগর যখন নিজেই হয়ে ওঠেন এক পৈশাচিক চরিত্রের রূপকার, তখন থমকে যায় সমাজ, মুখ থুবড়ে পড়ে গোটা মানবতা। এই বিদ্যালয়েরই প্রধান শিক্ষক সেলিম রেজার একের পর এক নির্মমতা, মারধর এবং শ্লীলতাহানির গল্পে এখন ভারী হয়ে উঠেছে পুরো এলাকার বাতাস।অনুসন্ধানে জানা যায়, সম্প্রতি এই শিক্ষকের পাশবিকতার শিকার হয়েছে বিদ্যালয়টির পঞ্চম শ্রেণীর এক শিক্ষার্থী। ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী বাড়িতে গিয়ে পরিবারকে বিস্তারিত জানালে কান্নায় ভেঙে পড়েন স্বজনরা। মেয়ের ওপর হওয়া এমন অন্যায়ের প্রতিকার চাইতে অভিভাবকরা বিদ্যালয়ে গেলে সেখানে তাদের কপালে জোটে চরম অপমান আর হুমকি।
অভিযোগ রয়েছে, প্রধান শিক্ষক সেলিম রেজা তার পালিত সন্ত্রাসী বাহিনী দিয়ে উল্টো ভুক্তভোগী পরিবারটিকে মারধরের ভয় দেখায়। শুধু তাই নয়, নিজের অপরাধ ঢাকতে চতুর এই শিক্ষক কিছু নামমাত্র ও কথিত সংবাদকর্মীদের ডেকে এনে বিদ্যালয়ে নাটক সাজান। নিজের ওপর হামলার মিথ্যা অপবাদ দিয়ে উল্টো ভুক্তভোগী পরিবারের বিরুদ্ধে থানায় একটি বানোয়াট মামলা দায়ের করেন, যা নিয়ে এলাকায় তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
সেলিম রেজা আদর্শ বিদ্যানিকেতন’ স্কুলের ৫ম শেণীর শিক্ষার্থী মোছা. জান্নাতুল বলেন, আমি প্রতিদিনের মতো স্কুলেই গিয়েছিলাম। কিন্তু স্যার আমার সাথে যে আচরণ করেছেন, তা আমি কখনো ভাবতেও পারিনি। ভয়ে-লজ্জায় আমি শুধু কেঁদেছি। বাড়িতে এসে আব্বু-আম্মুকে সব বলার পর তারা যখন স্কুলে বিচার চাইতে গেল, তখন স্যার গুন্ডা দিয়ে আমাদের মারার হুমকি দিলেন। আমরা গরিব বলে স্যার উল্টো আমাদের নামে মিথ্যা মামলা দিয়েছেন। আমি স্যারের এই অন্যায়ের বিচার চাই, আর কোনো মেয়ের যেন এমন অবস্থা না হয়।সেলিম রেজার এই পৈশাচিক রূপ এবারই প্রথম নয়। ক্ষমতার দাপট আর রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই তিনি এই বিদ্যালয়ে কায়েম করেছেন ত্রাসের রাজত্ব। এর আগেও এক ছাত্রীকে ক্লাসরুমে চোখে নির্মমভাবে আঘাত করেছিলেন এই প্রধান শিক্ষক। চোখের ভেতরের গুরুতর জখম নিয়ে সেই শিক্ষার্থী দীর্ঘদিন হাসপাতালে কাতরেছে।
কিন্তু সেবারও আইনের হাত থেকে বেঁচে যান সেলিম রেজা। স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে, নামমাত্র এলাকার শালিসের মাধ্যমে ৩ লক্ষ টাকা জরিমানা দিয়ে মুখ বন্ধ করা হয়েছিল সেই ছাত্রীর পরিবারের। আইনের সঠিক প্রয়োগ না হওয়ায় পার পেয়ে যান অভিযুক্ত এই শিক্ষক।সেলিম রেজা আদর্শ বিদ্যানিকেতন’ স্কুলের প্রাক্তন ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী মোছা. মিম খাতুন বলেন, স্যার সেদিন ক্লাসরুমের ভেতর আমার চোখে এত নির্মমভাবে আঘাত করেছিলেন যে, আমি দীর্ঘদিন হাসপাতালের বিছানায় যন্ত্রণায় ছটফট করেছি। আমার চোখটা চিরতরে নষ্ট হয়ে যেতে পারত। কিন্তু কোনো বিচার পাইনি। আমাদের গরিব পরিবারকে চাপ দিয়ে, স্থানীয় শালিসের মাধ্যমে মুখ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। তখন যদি স্যারের সঠিক বিচার হতো, তবে আজ নতুন করে আর কোনো বোনকে এভাবে চোখের জল ফেলতে হতো না।চোখের আঘাতের ঘটনা ধামাচাপা পড়ার কিছুদিন পরই সেলিম রেজার নির্মমতার শিকার হয় আরেক ছাত্র মো. মেহেদী হাসান। সামান্য ভুলের অপরাধে সেই ছাত্রের কানে এত জোরে থাপ্পড় মারা হয় যে, তার কানের পর্দা ফেটে যায়। পরবর্তীতে গুরুতর আহত সেই ছাত্রের পরিবারকে মামলা না করার জন্য বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি ও হুমকি প্রদর্শন করা হয়। লোকলজ্জা আর প্রাণভয়ে সেই পরিবারটিও শেষ পর্যন্ত চিকিৎসা বাবদ মাত্র ৭০ হাজার টাকা জরিমানা নিয়ে বিষয়টি রফাদফা করতে বাধ্য হয়। একের পর এক পার পেয়ে যাওয়ায় এই প্রধান শিক্ষক যেন নিজেকে আইনের ঊর্ধ্বে ভাবতে শুরু করেছেন।
সেলিম রেজা আদর্শ বিদ্যানিকেতন’ স্কুলের শিক্ষার্থী মেহেদী বলেন, আমার সামান্য একটু ভুল হয়েছিল, তার জন্য স্যার আমাকে এমনভাবে কানে থাপ্পড় মারবেন তা ভাবতেও পারিনি। থাপ্পড়টা খাওয়ার পর আমার মাথা ঘুরে ওঠে আর কান দিয়ে শুধু পোঁ পোঁ শব্দ আসছিল। ডাক্তার বলেছে আমার কানের পর্দা ফেটে গেছে। আমি যন্ত্রণায় হাসপাতালের বিছানায় কেঁদেছি, আর স্যার আমার পরিবারকে হুমকি দিয়েছেন। আমার বাবা-মা গরিব আর অসহায় বলে টাকার জোরে স্যার পার পেয়ে গেলেন। আমি এই অন্যায়ের বিচার চাই, যেন আর কোনো ছাত্রকে শিক্ষকের হাতে এভাবে পঙ্গু হতে না হয়।
এলাকাবাসী জানান, সেলিম রেজা শিক্ষক নামের কলঙ্ক। দীর্ঘদিন ধরে সে ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে বাচ্চাদের ওপর পৈশাচিক নির্যাতন চালাচ্ছে। একের পর এক ছাত্র-ছাত্রীর জীবন শেষ করছে, আর আমরা প্রতিবাদ করতে গেলে গুন্ডাবাহিনী দিয়ে আমাদের হুমকি দেওয়া হয়। এবার একজন পঞ্চম শ্রেণির মেয়ের ওপর যে অন্যায় হয়েছে, তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। আমরা এই জালিম শিক্ষকের অপসারণ এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই। প্রশাসন যদি এবারও কোনো ব্যবস্থা না নেয়, তবে পুরো চরকুড়ুলিয়াবাসী তীব্র আন্দোলনে নামতে বাধ্য হবে।শিক্ষকের লালসা আর নির্মমতার শিকার শিক্ষার্থীরা যখন ঘরের কোণে বসে কাঁদছে, তখন অভিযুক্ত শিক্ষক বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। টাকা, ক্ষমতা আর প্রভাবের জোরে অতীতে পার পেয়ে গেলেও, এবার প্রশাসনের টনক নড়বে কি না—তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা। নাকি আবারও কোনো তথাকথিত সমঝোতার চাদরে ঢাকা পড়ে যাবে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর আর্তনাদ আর পুরো একটি পরিবারের কান্না?সেলিম রেজা আদর্শ বিদ্যানিকেতন’ স্কুলের প্রধান শিক্ষক সেলিম রেজা অভিযোগ প্রসঙ্গে বলেন, শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করে না এবং মাঝে মাঝে বেয়াদবি করে। সেই কারণে তাদের সামান্য শাসন করা হয়েছে। কিন্তু ওই ছাত্রী কোনো উসকানিতে আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা সংবাদ সম্মেলন করেছে, যার প্রতিবাদে এলাকাবাসী ও বিভিন্ন সংগঠন মানববন্ধনও করেছে। নিজের ছাত্রীকে মারধর করে জরিমানা দেওয়ার কোনো কারণ নেই। তবে অতীতে যে ৩ লক্ষ টাকা দেওয়া হয়েছিল, তা ছিল একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা। পরিস্থিতি সামাল দিতে, সামাজিক ও রাজনৈতিক চাপে এবং বিদ্যালয় সচল রাখার স্বার্থে বাধ্য হয়ে তখন ওই টাকা দিতে হয়েছিল।ঈশ্বরদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) হাসান মোহাম্মদ শোয়াইব বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে এখনো আমাদের কাছে লিখিত বা সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ আসেনি। তবে অভিযোগ পেলে ঘটনাটি তদন্ত করে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।
চরকুড়ুলিয়ার প্রতিটি বিবেকবান মানুষ এখন এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষক সেলিম রেজার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাচ্ছেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন প্রেস ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকবৃন্দরা ও প্রমুখ।





0 মন্তব্যসমূহ