লোড হচ্ছে...

মোঃ ফরিদ মিয়া এর দৃষ্টিতে: জাতীয় উন্নয়নের পূর্বশর্ত মানসম্মত শিক্ষা ও শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নে করণীয়।

                                                                মোঃ ফরিদ মিয়া
শিক্ষার মান উন্নয়ন একটি চলমান প্রক্রিয়া, যা সরকার, শিক্ষক, অভিভাবক এবং সমাজের সচেতন নাগরিকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়। জাতীয় জীবনের সর্বক্ষেত্রে উন্নয়নের পূর্বশর্ত হলো শিক্ষা। ব্যক্তির আচরণে ইতিবাচক পরিবর্তনের মাধ্যমে সমাজে যে কল্যাণকর পরিবর্তন আসে, তাকেই প্রকৃত শিক্ষা বলা যায়। আর শিক্ষার মান উন্নয়ন বলতে শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিতকরণকে বোঝায়। শিক্ষার মান উন্নয়নের প্রধান উপাদান হলো শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষাক্রম, শিখন-শেখানো পদ্ধতি এবং উপযুক্ত শিক্ষার পরিবেশ। এসব উপাদানের কোনো একটির ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন সম্ভব নয়। বরং সব উপাদানের সমন্বিত ও কার্যকর ব্যবস্থাপনাই মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে পারে।

শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকায়ন, সনাতন শিক্ষাপদ্ধতির সঙ্গে প্রযুক্তির সমন্বয়, শিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং সম্মানজনক বেতন-কাঠামো প্রবর্তন মানসম্মত শিক্ষা বাস্তবায়নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক। স্বাধীনতার ৫৫ বছরে এসেও আমরা শিক্ষা ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য পুরোপুরি অর্জন করতে পারিনি। বর্তমান সময়ে শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করতে সর্বাগ্রে প্রয়োজন একটি সুদূরপ্রসারী ও স্থিতিশীল পরিকল্পনা। অপরিকল্পিত শিক্ষানীতি, ঘন ঘন কারিকুলাম পরিবর্তন এবং অসুস্থ প্রতিযোগিতা শিক্ষার মান উন্নয়নের বড় অন্তরায়। এসবের ফলে পুরো শিক্ষা ব্যবস্থা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মানসম্মত শিক্ষা অর্জনের লক্ষ্যে প্রথমত, সরকারকে দীর্ঘমেয়াদি ও সুস্পষ্ট শিক্ষানীতি প্রণয়ন করতে হবে। শিক্ষার্থীদের সক্ষমতা ও যুগোপযোগী চাহিদার ভিত্তিতে পাঠ্যক্রম প্রণয়ন, প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার, শিক্ষকদের জীবনমান উন্নয়ন এবং নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে শিক্ষার মান বৃদ্ধি সম্ভব।

অন্যদিকে, উন্নয়নশীল দেশ হওয়া সত্ত্বেও শিক্ষাখাতে প্রতিবছর বাজেটে যে পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়, তা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। ইউনেস্কোর সুপারিশ অনুযায়ী বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে মোট দেশজ উৎপাদনের (GDP) প্রায় ৭ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ রাখা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, শিক্ষার মান উন্নয়নে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানই মূল কেন্দ্রবিন্দু। শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার অগ্রগতি নিশ্চিত করতে দক্ষ ও যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ, রুটিনমাফিক পাঠদান, পর্যাপ্ত আইসিটি (ICT) সুবিধা, নিয়মিত তদারকি, অভিভাবক সমাবেশ, প্রয়োজনে হোম ভিজিট এবং বিভিন্ন সহশিক্ষা কার্যক্রম যেমন খেলাধুলা, স্কাউটিং, বিতর্ক, সাংস্কৃতিক ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিত্ব ও গুণগত শিক্ষা বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

তৃতীয়ত, আমরা জানি শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড, আর শিক্ষার মেরুদণ্ড শিক্ষক। শিক্ষার মান উন্নয়নে শিক্ষকের ভূমিকা সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। একজন দক্ষ, আদর্শ ও মানসম্মত শিক্ষক তাঁর জ্ঞান, দক্ষতা, শিক্ষাদান পদ্ধতি এবং নৈতিক মূল্যবোধের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের জ্ঞানার্জন, চরিত্র গঠন ও মানবিক গুণাবলি বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তাই শিক্ষকদের উপযুক্ত পারিশ্রমিক, পেশাগত মর্যাদা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনের কার্যকর তদারকিও শিক্ষার মান নিশ্চিত করতে সহায়ক। চতুর্থত, একটি শিশুর শিক্ষার ভিত্তি গড়ে ওঠে পরিবারে। তাই শিক্ষার মান উন্নয়নে অভিভাবকের ভূমিকা অপরিসীম। সন্তানের লেখাপড়ার অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি, নিয়মিত খোঁজখবর রাখা, শিক্ষকদের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখা এবং পারিবারিক মূল্যবোধ, শৃঙ্খলা ও নৈতিক শিক্ষা চর্চায় উৎসাহিত করা শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।

পঞ্চমত, শিক্ষার মানোন্নয়নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো শিক্ষার্থী। যাদের জন্য এত আয়োজন, সেই শিক্ষার্থীদের একটি অংশ আজ লেখাপড়ার প্রতি অনাগ্রহী হয়ে পড়ছে। বর্তমানে শিক্ষার উপকরণ, প্রযুক্তি ও তথ্যপ্রাপ্তি আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় সহজ হলেও আশানুরূপ শিক্ষার মান অর্জিত হচ্ছে না। এর অন্যতম কারণ প্রযুক্তির অপব্যবহার, পড়াশোনায় অনীহা, জ্ঞানচর্চার অভাব এবং অধ্যবসায়ের ঘাটতি। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধের চর্চা, নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে উপস্থিতি, পাঠদানে সক্রিয় অংশগ্রহণ, শিক্ষক ও অভিভাবকের পরামর্শ মেনে চলা এবং জ্ঞানার্জনের প্রতি কৌতূহলী মনোভাব গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। পরিশেষে বলা যায়, দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় গুণগত মান উন্নয়নে সরকার, শিক্ষক, অভিভাবক, শিক্ষার্থী এবং সমাজের সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টা ও আন্তরিক সহযোগিতাই পারে একটি দক্ষ, নৈতিক, মানবিক ও জ্ঞানভিত্তিক প্রজন্ম গড়ে তুলতে। আগামীর বাংলাদেশ হোক মানসম্মত শিক্ষা ও আলোকিত নাগরিকের বাংলাদেশ এই প্রত্যাশাই রইল।

লেখক ও প্রাবন্ধিক
মোঃ ফরিদ মিয়া
মাস্টার্স (অর্থনীতি), বি.এড., এম.এড. (প্রথম শ্রেণি)
সিনিয়র শিক্ষক
কালী প্রসাদ উচ্চ বিদ্যালয়
মুন্সীবাজার, কমলগঞ্জ, মৌলভীবাজার।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ