কায়সার হাবীব পাপ্পু দিনাজপুর প্রতিনিধি:Sm tv media:দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাওয়ার শঙ্কায় পড়েছে প্রাচীন মালো সম্প্রদায়ের স্বতন্ত্র পরিচয়, ভাষা, সংস্কৃতি ও শতবর্ষী ঐতিহ্য। ভূমিস্বল্পতা, উত্তরাধিকার নিয়ে অনিশ্চয়তা, সীমিত কর্মসংস্থান এবং নানা আর্থসামাজিক প্রতিবন্ধকতার মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছেন এই জনগোষ্ঠীর মানুষ। পূর্বপুরুষদের ইতিহাস ও সামাজিক রীতিনীতি সংরক্ষণের উদ্যোগ না থাকায় নতুন প্রজন্মের কাছে হারিয়ে যেতে বসেছে তাঁদের শেকড়ের পরিচয়।দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটসহ উত্তরাঞ্চলে ঐতিহাসিকভাবে ‘বুনা’ নামে পরিচিত এই জনগোষ্ঠীর প্রধান জীবিকা কৃষিশ্রম। শনিবার (১০ অক্টোবর) ঘোড়াঘাট উপজেলার শিধল গ্রামে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কেউ পুরোনো পদ্ধতিতে মাছ ধরার জাল বুনছেন, আবার কেউ রান্নার জন্য গোবরের জ্বালানি শুকাচ্ছেন। কষ্টের হলেও এই প্রাত্যহিক কাজের মধ্য দিয়েই তাঁরা টিকিয়ে রেখেছেন নিজেদের আদি ঐতিহ্যস্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ঘোড়াঘাটে বর্তমানে প্রায় ১৫০টি মালো পরিবার বসবাস করছে। যাদের অধিকাংশই অন্যের জমিতে ধান রোপণ, ফসল কাটা ও জমি পরিচর্যার কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। কাজের অনিয়মিত সুযোগ ও সীমিত আয় তাঁদের জীবনযাত্রাকে প্রতিনিয়ত কঠিন করে তুলছে।জীবন-জীবিকার পাশাপাশি ভূমির স্বত্ব ও উত্তরাধিকার নিয়েও ঘোর অনিশ্চয়তায় রয়েছে সম্প্রদায়টি। মালো সমাজে পুত্রসন্তান না থাকলে কন্যা বা বিধবা স্ত্রীর সম্পত্তি ভোগদখলের নিজস্ব প্রথা রয়েছে। কিন্তু এসব প্রচলিত সামাজিক প্রথার সঙ্গে দেশের আইনের সমন্বয় ও সঠিক নথিবদ্ধকরণ না থাকায় ভূমির অধিকার সুরক্ষায় জটিলতা তৈরি হচ্ছে। প্রবীণদের কাছে থাকা মৌখিক ইতিহাস ও সামাজিক রীতিনীতির লিখিত রূপ না থাকায় প্রজন্মান্তরে তা হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।ভারতের ঝাড়খণ্ড ও নাগপুর অঞ্চল থেকে আসা এই জনগোষ্ঠীর উল্লেখ পাওয়া যায় ১৯৫০ সালের 'স্টেট অ্যাকুইজিশন অ্যান্ড টেন্যান্সি অ্যাক্ট'-এর ৯৭ ধারায়, যেখানে 'বুনিয়াস' হিসেবে তাঁদের স্বীকৃতি রয়েছে। এ ছাড়া ১৯৪০ সালের সিএস ও ১৯৬২ সালের আরএস রেকর্ডেও তাঁদের 'বুনা' পরিচয়ের উল্লেখ মেলে। ১৩টি আত্মগোত্রে বিভক্ত ও প্রধানত সাদরী ভাষায় কথা বলা এই জনগোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষায় সরকারি উদ্যোগের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় প্রবীণ সিন্ধু পাল মালো।
ষমালো সম্প্রদায়ের সংকট নিয়ে ঘোড়াঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রুবানা তানজিন জানান, মালো সম্প্রদায়ের ভূমির অধিকার সুরক্ষা, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও সংস্কৃতি সংরক্ষণে তাঁদের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা জরুরি। উপজেলা প্রশাসন সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে সরকারি সুযোগ-সুবিধা পৌঁছে দেওয়া এবং তাঁদের জীবনমান উন্নয়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।সংশ্লিষ্টদের মতে, কেবল আর্থিক সহায়তাই নয়, বরং ভূমিসংক্রান্ত রেকর্ড সংরক্ষণ, শিক্ষার বিস্তার, দক্ষতা উন্নয়ন এবং গবেষণামূলক উদ্যোগের মাধ্যমেই ঘোড়াঘাটের এই প্রাচীন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্য ও অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখবে ।

0 মন্তব্যসমূহ