লোড হচ্ছে...

দুর্গাপূজা ঘিরে দিঘলিয়ার পালপাড়ায় মৃৎশিল্পীদের ব্যস্ততা, বেড়েছে খরচ—লাভ নিয়ে শঙ্কা ।


জাহিদ হোসেন, স্টাফ রিপোর্টার, খুলনা শারদীয় দুর্গোৎসবকে ঘিরে খুলনার দিঘলিয়া উপজেলার পালপাড়ায় এখন মৃৎশিল্পীদের কর্মব্যস্ততা তুঙ্গে। কাদা-মাটি আর নিপুণ হাতের কারুকাজে ধীরে ধীরে প্রাণ পাচ্ছে দুর্গাপ্রতিমাসহ নানা ধরনের মাটির সামগ্রী। পূজার আগমনী বার্তায় দিন-রাত এক করে কাজ করছেন কারিগররা। তবে কর্মব্যস্ততা বাড়লেও কাঁচামাল, রং ও সাজসজ্জার উপকরণের মূল্যবৃদ্ধিতে তাঁদের কপালে চিন্তার ভাঁজ। উৎপাদন খরচ বাড়লেও প্রত্যাশিত আয় না বাড়ায় এবার লাভের মুখ দেখা নিয়ে শঙ্কায় পড়েছেন তাঁরা।পালপাড়ার কারিগর সুমীর চন্দ্র পাল জানান, গত বছরের তুলনায় এ বছর মাটির সামগ্রী তৈরিতে খরচ বেড়েছে। কিন্তু সেই অনুপাতে বাড়েনি বিক্রয়মূল্য ও আয়। ফলে দিনরাত পরিশ্রম করেও কাঙ্ক্ষিত লাভের হিসাব মেলানো কঠিন হয়ে পড়েছে।তিনি মাটি দিয়ে প্রায় ৩২ ধরনের ফলমূল ও সবজির প্রতিরূপ তৈরি করেন। এসবের মধ্যে রয়েছে রসুন, ঝিঙা, বেগুন, আপেল, বেল, আম, টমেটো, স্ট্রবেরি, লিচু, কলা, কামরাঙা, করলা, পটল, ডাব ও নারকেলসহ বিভিন্ন সামগ্রী। তাঁর তৈরি এসব মাটির পণ্য খুলনার নিউমার্কেট, ফুলতলা ও বিভিন্ন হাটবাজারের পাশাপাশি বগুড়ার পালপাড়া এলাকাতেও সরবরাহ করা হয়।একই এলাকার কারিগর সত্য পাল তৈরি করেন কলস, চুলা, পাটা, হাঁড়ি, কুলা, বদনা ও জগসহ দৈনন্দিন ব্যবহারের বিভিন্ন মাটির সামগ্রী। পাশাপাশি দুর্গাপ্রতিমা তৈরির কাজেও যুক্ত রয়েছেন তিনি। বংশপরম্পরায় চলে আসা এই পেশার মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহের পাশাপাশি মৃৎশিল্পের ঐতিহ্য ধরে রাখার চেষ্টা করছেন তাঁরা।কারিগর বিকাশ পাল জানান, গত বছরের মতো এবারও তিনি দুর্গাপ্রতিমার দুটি সেট তৈরির কাজ হাতে নিয়েছেন। বর্তমানে প্রতিমাগুলোতে রং করার কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন। খরচ বেড়ে যাওয়ায় আরও প্রতিমা তৈরির ইচ্ছা থাকলেও পর্যাপ্ত অর্ডার না পাওয়ায় তা সম্ভব হয়নি। তাই সীমিত অর্ডার নিয়েই কাজ চালিয়ে যেতে হচ্ছে তাঁকে।অন্যদিকে, পালপাড়ার জয়মতি পালও মাটির সামগ্রী তৈরিতে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। তাঁর হাতে তৈরি হচ্ছে মাটির গরু, তাল, ব্যাংক, ঘোড়া ও বিভিন্ন ধরনের প্রতিমাসহ নানা উপকরণ। এসব সামগ্রী তৈরি ও বিক্রির আয়ের ওপর নির্ভর করেই চলছে তাঁর জীবন-জীবিকা।ঐতিহ্য রক্ষায় টিকে থাকার লড়াইদিঘলিয়ার পালপাড়ার শিল্পীদের কাছে মাটির কাজ কেবল জীবিকা নির্বাহের মাধ্যম নয়; এটি তাঁদের বংশপরম্পরায় বহমান ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও সৃজনশীলতার পরিচয়। দুর্গাপূজাকে সামনে রেখে কাজের চাপ বাড়লেও উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, পর্যাপ্ত অর্ডারের অভাব এবং ন্যায্য মূল্য না পাওয়ার শঙ্কা তাঁদের উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলছে।শিল্পীদের আশঙ্কা, এভাবে উৎপাদন খরচ বাড়তে থাকলে ভবিষ্যতে মৃৎশিল্প টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। নতুন প্রজন্মের কাছে এই পেশার আকর্ষণ কমে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। তাই মৃৎশিল্পীদের ন্যায্য পারিশ্রমিক নিশ্চিত করা, তাঁদের তৈরি পণ্যের উপযুক্ত মূল্য প্রদান এবং ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পের প্রসারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা কামনা করেছেন তাঁরা।দুর্গামণ্ডপে যখন মাটির প্রতিমা দেবীর আগমনী বার্তা ছড়াবে, তখন সেই নান্দনিক সৌন্দর্যের আড়ালে থাকবে দিঘলিয়ার পালপাড়ার শিল্পীদের নিপুণ হাতের ছোঁয়া, নিরলস পরিশ্রম এবং জীবিকা টিকিয়ে রাখার নীরব সংগ্রাম। তাঁদের হাতেই মাটি পায় শিল্পের রূপ, আর সেই শিল্পের মধ্য দিয়েই বেঁচে থাকে বাংলার শতবর্ষী ঐতিহ্য

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ