বায়েজিদ জোয়ার্দার চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধিঃ Smtv Media চুয়াডাঙ্গা।
চুয়াডাঙ্গা জেলার জীবননগর উপজেলার ধোপাখালী গ্রাম ১৯৭১ সালে রণকৌশলগতভাবে বিবেচনায় ছিলো জীবননগরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। ধোপাখালীর যুদ্ধের সবচেয়ে বড় নাম মুহাম্মদ মুস্তাফিজুর রহমান (বীর বিক্রম) অদম্য সাহসী এক যোদ্ধা।।চুয়াডাঙ্গা জেলার জীবননগর উপজেলার অন্তর্গত ধোপাখালী। সীমান্ত এলাকা। রণকৌশলগত বিবেচনায় ১৯৭১ সালে ধোপাখালী ছিল যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। কারণ জীবননগর থেকে পাকা সড়ক কোটচাঁদপুর হয়ে ঢাকা-যশোর মহাসড়কের সঙ্গে যুক্ত। সেজন্য পাকিস্তান সেনাবাহিনী তখন এখানে শক্ত একটি ঘাঁটি স্থাপন করে। প্রতিরক্ষায় নিয়োজিত ছিল ৩৮ ফ্রন্টিয়ার ফোর্স (এফএফ)।মুক্তিযুদ্ধকালে এখানে অনেকবার খণ্ড ও গেরিলাযুদ্ধ সংঘটিত হয়। মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত পর্যায়ে সীমান্তে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিন্যাস, জনবল ও অস্ত্রশক্তি ইত্যাদি নিরূপণের জন্য মুক্তি ও মিত্রবাহিনী যৌথভাবে একের পর এক আক্রমণ চালাতে থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় ১২ নভেম্বর মুক্তি ও মিত্রবাহিনী যৌথভাবে ধোপাখালীতে আক্রমণ করে। এই যুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর নেতৃত্ব দেন মুহাম্মদ মুস্তাফিজুর রহমান।পরিকল্পনানুযায়ী মুক্তিযোদ্ধারা তাঁর নেতৃত্বে ভারতের বানপুর থেকে রাত আটটায় ধোপাখালীর উদ্দেশে রওনা হন। গভীর রাতে কাছাকাছি পৌঁছে তাঁরা কয়েকটি উপদলে বিভক্ত হন। তারপর নিঃশব্দে অবস্থান নেন পাকিস্তানি ঘাঁটির ২০-২৫ গজের মধ্যে। নির্ধারিত সময় তাঁরা একযোগে আক্রমণ শুরু করেন। পাকিস্তান সেনাবাহিনীও সঙ্গে সঙ্গে পাল্টা গুলিবর্ষণ শুরু করে।পাকিস্তানি ঘাঁটিতে ছিল মর্টার, মেশিনগানসহ অন্যান্য ভারী অস্ত্র। এ ছাড়া কাছাকাছি ছিল তাদের একটি আর্টিলারি ব্যাটারি। প্রথমে তারা তিনটি মেশিনগান দিয়ে গুলিবর্ষণ শুরু করে। এরপর শুরু হয় আর্টিলারি মর্টার ফায়ার। সেদিনই তারা সেখানে প্রথম আর্টিলারির ব্যবহার করে। মুহাম্মদ মুস্তাফিজুর রহমান এতে দমে না গিয়ে সহযোদ্ধাদের নিয়ে সাহস ও বীরত্বের সঙ্গে পাকিস্তানি আক্রমণ মোকাবিলা করেন। এই অদম্য মনোবল ও সাহসিকতা দেখে তাঁর সহযোদ্ধারাও উজ্জীবিত হন। তাঁদের প্রবল আক্রমণে পাকিস্তান সেনাবাহিনী কোণঠাসা হয়ে পড়ে। রক্তক্ষয়ী এই যুদ্ধের একপর্যায়ে রাত দুইটার দিকে মুহাম্মদ মুস্তাফিজুর রহমান আহত হন। তাঁর পেটে গুলি লাগে। আহত হওয়ার পর সহযোদ্ধারা তাঁকে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যেতে চাইলে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করে যুদ্ধক্ষেত্রেই থেকে যান। প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে শেষ পর্যন্ত যুদ্ধে নেতৃত্ব দেন। সারা রাত যুদ্ধের পর সকাল সাড়ে ছয়টার দিকে পাকিস্তানি সেনারা রণে ভঙ্গ দেয়। তখন মুহাম্মদ মুস্তাফিজুর রহমান ভারতে ক্যাম্পে ফিরে যান। এরপর চিকিৎসার জন্য তাঁকে কৃষ্ণনগরে ভারতীয় সেনাবাহিনীর কোর ফিল্ড হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেদিন এই যুদ্ধে প্রায় ১৯-২০ জন পাকিস্তানি সেনা নিহত ও অনেক আহত হয়। মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষে তিনিসহ কয়েকজন আহত হন। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর এই বিপর্যয়ে দক্ষিণ-পশ্চিম রণাঙ্গনে মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল দারুণভাবে বৃদ্ধি পায়। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের কর্মকর্তা মুহাম্মদ মুস্তাফিজুর রহমান ১৯৭১ সালে ঢাকায় কর্মরত ছিলেন। তখন তাঁর পদবি ছিল ক্যাপ্টেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে ঢাকা থেকে পালিয়ে যুদ্ধে যোগ দেন। ৮ নম্বর সেক্টরের বানপুর সাব-সেক্টরের অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই সাব-সেক্টরের আওতাধীন এলাকার বিভিন্ন স্থানে তিনি যুদ্ধ করেন। বেশির ভাগ যুদ্ধেই তিনি অগ্রভাগে থাকতেন। মুক্তিযুদ্ধে সাহস ও বীরত্বের জন্য মুহাম্মদ মুস্তাফিজুর রহমানকে বীর বিক্রম খেতাবে ভূষিত করা হয়। ১৯৭৩ সালের গেজেট অনুযায়ী তাঁর বীরত্বভূষণ নম্বর ৯। মুহাম্মদ মুস্তাফিজুর রহমান স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে চাকরি করেন। পর্যায়ক্রমে সেনাপ্রধান পদে উন্নীত হয়ে অবসর নেন। তখন তাঁর পদবি ছিল জেনারেল। তিনি ২০০৮ সালে মারা গেছেন। তাঁর পৈতৃক বাড়ি রংপুর সিটি করপোরেশনের অন্তর্ভুক্ত ধাপে। উত্তরাধিকারীদের বর্তমান ঠিকানা—বাড়ি ১৪৯, সড়ক ৪, মহাখালী ডিওএইচএস, ঢাকা। তাঁর বাবার নাম আবদুস সাত্তার, মা জরিনা খাতুন। স্ত্রী রাশিদা রহমান। তাঁদের তিন মেয়ে। এ সময় উপস্থিত ছিলেন প্রেস ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া অনলাইন মিডিয়ার সাংবাদিকবৃন্দরা ও প্রমুখ।

0 মন্তব্যসমূহ