লোড হচ্ছে...

দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে অবহেলায় অযত্নে নষ্ট হচ্ছে সাড়ে ৫০০ বছরের পুরাতন সুরা মসজিদ।


কায়সার হাবীব পাপ্পু দিনাজপুর প্রতিনিধিঃ Smtv Media 

দিনাজপুরে  সংরক্ষণ সংকটে ঘোড়াঘাটের ঐতিহাসিক সুরা মসজিদ। সময়ের সাক্ষী হয়ে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে দাঁড়িয়ে আছে ঘোড়াঘাটের ঐতিহাসিক সুরা মসজিদ। চারপাশে পিনপতন নীরবতা, দেওয়ালে সময়ের দাগ—আর তার মাঝেই লুকিয়ে আছে ইতিহাস, অবহেলা এবং এক অনাবিষ্কৃত সম্ভাবনার গল্প। মসজিদটি সুলতানি আমলে (১৪৯৩–১৫১৮ খ্রিস্টাব্দ) নির্মিত বলে ধারণা করা হয়। সে হিসাবে প্রায় সাড়ে পাঁচশত বছরের পুরোনো এই মসজিদটি সুলতানি আমলের স্থাপত্য ঐতিহ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। তবে যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে মসজিদের বিভিন্ন অংশে ফাটল, প্লাস্টার খসে পড়া এবং টেরাকোটা অলংকরণের ক্ষয়ের চিহ্ন এখন স্পষ্ট। দীর্ঘদিন ধরে বড় ধরনের কোনো সংস্কার কাজ না হওয়ায় কাঠামোগত ঝুঁকিও দিন দিন বাড়ছে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। স্থানীয়দের ক্ষোভ ও অবহেলার চিত্র স্থানীয় বাসিন্দা পারভেজ বলেন, “এটি আমাদের এলাকার ঐতিহ্য ও পরিচয় বহন করে। কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে দিন দিন এর সৌন্দর্য ও স্থায়িত্ব নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।” আরেকজন বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “বর্ষাকালে দেওয়াল বেয়ে পানি ভেতরে ঢোকে, যা স্থাপত্যটির ভীষণ ক্ষতি করছে। কিন্তু এটি নিয়মিত দেখভালের কোনো উদ্যোগ নেই।”এদিকে, উপজেলা সদর ওসমানপুরের বাসিন্দা মনু মিয়া ভিন্ন একটি সংকটের দিকে আঙুল তুলে বলেন, “মসজিদ নিয়ে আগে অভ্যন্তরীণ দলাদলি ও দালালি বন্ধ করতে হবে। মসজিদের নামে টাকা তোলা হয়, কিন্তু সেই টাকা কোথায় যায়? এগুলো বন্ধ হওয়া দরকার। এটি সরকারের তথা রাষ্ট্রের সম্পদ, এটা রক্ষা করার দায়িত্ব আমাদের সকলের।”ঐতিহাসিক এই সুরা মসজিদটি বাংলাদেশ সরকারের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর কর্তৃক একটি সংরক্ষিত পুরাকীর্তি। সরকারি রেকর্ড অনুযায়ী, ১৯৮৫–৮৬ সালে এটিকে প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে তালিকাভুক্ত করা হয়। তবে তালিকাভুক্তির চার দশক পেরিয়ে গেলেও নিয়মিত ও পরিকল্পিত সংরক্ষণ কার্যক্রমের অভাব নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ও প্রশ্ন রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, নানাবিধ সংকটের বিষয়টি একাধিকবার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও এখনো দৃশ্যমান বা কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি।স্থানীয় বিজ্ঞ ও প্রবীণ ব্যক্তিদের মতে, শুধু সময়ের ক্ষয়ই নয়—অপরিকল্পিত সংস্কারের চেষ্টাও ঐতিহাসিক এই স্থাপনাটির জন্য নতুন হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঐতিহ্যবাহী বা প্রাচীন স্থাপনায় আধুনিক নির্মাণ উপকরণের যত্রতত্র ব্যবহার এর মৌলিক স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য ও প্রাচীনত্বকে চিরতরে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। অপার সম্ভাবনা ও দর্শনার্থীদের সমাগম তবে সংকটের চেয়েও এখানে বড় হয়ে উঠছে এর অপার সম্ভাবনা। সুরা মসজিদকে কেন্দ্র করে একটি পরিকল্পিত পর্যটন অবকাঠামো গড়ে তোলা গেলে এটি শুধু ধর্মীয় বা ঐতিহাসিক স্থাপনা নয়, বরং পুরো আঞ্চলিক অর্থনীতির চালিকাশক্তিতে পরিণত হতে পারে। বর্তমানে সাধারণ দিনগুলোতে প্রতিদিন গড়ে ৫০০ থেকে ৬০০ জন দর্শনার্থী এখানে আসেন—কেউ ঘুরতে, আবার কেউবা আসেন মানত পূরণ করতে। আর শুক্রবার কিংবা ছুটির দিনগুলোতে এই সমাগম দেড় থেকে দুই হাজারে গিয়ে ঠেকে। পর্যাপ্ত অবকাঠামো, যোগাযোগ সুবিধা ও যথাযথ প্রচারণা নিশ্চিত করা গেলে এই সংখ্যা কয়েক গুণ বাড়ানো সম্ভব।স্থানীয় জামাল উদ্দিন নামে এক প্রভাষক বলেন, “এই জায়গাটাকে যদি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করে গড়ে তোলা যায়, তবে ঘোড়াঘাটের সামগ্রিক চিত্রই বদলে যেতে পারে। পর্যটনবান্ধব অবকাঠামো উন্নয়ন, তথ্যফলক ও সঠিক ঐতিহাসিক বিবরণ সংযোজন, প্রশিক্ষিত গাইড নিয়োগ এবং স্থানীয় জনগণকে এই প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত করা গেলে সুরা মসজিদ একটি পূর্ণাঙ্গ ও আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে স্বীকৃতি পেতে পারে।”কান্তজিউ মন্দিরের মতো উন্নয়ন কি কেবলই স্বপ্ন? দৃষ্টান্ত হিসেবে একই জেলার কান্তজিউ মন্দিরের কথা উল্লেখ করা যায়। নিয়মিত সংরক্ষণ, উন্নত অবকাঠামো এবং কার্যকর প্রচারণার ফলে কান্তজিউ মন্দির আজ দেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। সেখানে প্রতিদিন উল্লেখযোগ্য সংখ্যক দেশি-বিদেশি পর্যটকের সমাগম ঘটে, যা স্থানীয় অর্থনীতিতে ব্যাপক ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। অন্যদিকে, সমপর্যায়ের ঐতিহাসিক গুরুত্ব থাকা সত্ত্বেও সুরা মসজিদ এখনো সেই ধরনের সরকারি উন্নয়ন সুবিধা থেকে বঞ্চিত। প্রয়োজনীয় দূরদর্শী পরিকল্পনা ও উদ্যোগের অভাবে এটি সম্ভাবনার শীর্ষবিন্দুতে থেকেও পিছিয়ে রয়েছে। প্রশাসনের বক্তব্য ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা যোগাযোগ করা হলে ঘোড়াঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রুবানা তানজিন জানান, “মসজিদটির পূর্বে স্থানীয়ভাবে যে কমিটি ছিল, মূলত তাদের অভ্যন্তরীণ কোন্দলই বর্তমান সমস্যার মূল কারণ। বর্তমানে কমিটির দায়িত্বে আমরা (উপজেলা প্রশাসন) থাকলেও, এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তারা আদালতে মামলা করে রেখেছে বলে জানতে পেরেছি। তবে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সাথে আমার কথা হয়েছে, তারা চলতি অর্থবছর থেকেই এর উন্নয়ন কাজ শুরু করার আশ্বাস দিয়েছেন।”এ বিষয়ে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর রংপুর আঞ্চলিক কার্যালয়ের ফিল্ড অফিসার আবু সাঈদ ইনাম তানভীরুল বলেন, “সুরা মসজিদ সংরক্ষণ ও উন্নয়নের জন্য আমাদের ব্যাপক কর্মপরিকল্পনা রয়েছে। আঞ্চলিক পরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী মহোদয়ের সাথে এই পর্যন্ত তিনবার কথা হয়েছে, তিনি নিজে এ বিষয়ে অত্যন্ত আন্তরিক ও আগ্রহী। আমরা এই ২০২৬–২৭ অর্থবছরেই এখানে কাজ শুরু করব। কান্তজিউ মন্দিরের মতো এখানেও পর্যটন সুবিধাসমূহ নিশ্চিত করা হবে; যার মধ্যে মসজিদটির বাউন্ডারি ওয়াল নির্মাণসহ দর্শনার্থীদের জন্য সুপেয় পানি, আধুনিক ওয়াশরুম ও বসার জায়গা স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। অতীতের গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহ্য আর বর্তমানের অবহেলার দোলাচলে দাঁড়িয়ে আছে সাড়ে পাঁচশ বছরের সুরা মসজিদ। তবে সঠিক পরিকল্পনা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতার অবসান এবং সমন্বিত প্রচেষ্টায় এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি শুধু রক্ষাই পাবে না—বরং ঘোড়াঘাটের জন্য উন্মোচন করবে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির এক নতুন দিগন্ত। এখন দেখার বিষয়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের এই আশ্বাসের বাণী কতটা দ্রুত বাস্তবে রূপ নেয়। এ সময় উপস্থিত ছিলেন প্রেস ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকবৃন্দরা ও প্রমুখ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ