লোড হচ্ছে...

রাজশাহীতে সাহেববাজার জিরোপয়েন্টের সেই চিরচেনা বৃদ্ধা বোরখা ঢাকা আত্মসম্মান আর এক মুঠো খাবারের লড়াই।





জাহিদুল ইসলাম সানি ​বিশেষ প্রতিবেদনঃ Smtv Media


রাজশাহী মহানগরীর ব্যস্ততম এলাকা সাহেববাজার জিরোপয়েন্ট। প্রতিদিন হাজারো মানুষের ব্যস্ত পায়ে চলাফেরা, যানবাহনের হর্ন আর কোলাহলে মুখরিত থাকে এই চত্বর। কিন্তু এই চেনা ব্যস্ততার মাঝেই দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে একটি দৃশ্য জিরোপয়েন্টের নিয়মিত যাতায়াতকারীদের বিবেককে নাড়া দিয়ে যাচ্ছে।
​তিনি বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছেন। ঠিকমতো পা ফেলে হাঁটতেও পারেন না। শরীরটা কাঁপতে থাকে অবশ অবসাদে। কিন্তু এক অদ্ভুত আত্মসম্মান আর ধর্মীয় রীতিনীতির প্রতি শ্রদ্ধাবোধ তাকে আগলে রেখেছে। যত কষ্টই হোক না কেন, দীর্ঘ এই পথচলায় তাকে কোনোদিন বোরখা ও হিজাব ছাড়া দেখা যায়নি। তীব্র গরম কিংবা হাড়কাঁপানো শীত—সবকিছুকে উপেক্ষা করে নিজের আব্রু বজায় রেখেই তিনি রাস্তায় নামেন। ভিক্ষা শব্দটাকে হয়তো তার আত্মসম্মান মেনে নেয় না, কিন্তু এক মুঠো অন্ন জোগাড়ের তাড়নায় বাধ্য হয়েই তাকে মানুষের দ্বারে হাত পাততে হয়।বেদনাদায়ক বিষয় হলো, প্রতিদিন এই রাস্তা দিয়ে হাজারো মানুষ, বিলাসবহুল গাড়ি চলে গেলেও, এই অসহায় বৃদ্ধা নারীর পাশে দাঁড়ানোর মতো মানুষ খুব কমই চোখে পড়ে। অনেকে তাকে এড়িয়ে যান, অনেকে হয়তো এক-দুই টাকার কয়েন ছুড়ে দিয়ে নিজের দায়িত্ব শেষ করেন। কিন্তু তার এই অসহায়ত্বের স্থায়ী কোনো সমাধান মেলেনি বছরের পর বছর ধরে।সরকারি তহবিল ও সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী: আসলেই কি কোনো ফান্ড নেই?অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে, এই ধরনের চরম অসহায় মানুষের জন্য কি সরকারের কোনো তহবিল বা ফান্ড নেই?বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশ সরকারের সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে বেশ কিছু বড় সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী (Social Safety Net) কর্মসূচি রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য (১) বয়স্ক ভাতা (Old Age Allowance): নির্দিষ্ট বয়সোর্ধ্ব (নারীদের ক্ষেত্রে সাধারণত ৬২ বছর এবং পুরুষদের ক্ষেত্রে ৬৫ বছর) অসচ্ছল ও দরিদ্র মানুষদের প্রতি মাসে নির্দিষ্ট হারে ভাতা দেওয়া হয়।(২)অসহায় ও দুস্থদের জন্য অনুদান: জেলা ও উপজেলা প্রশাসন এবং সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাধ্যমে জরুরি ও বিশেষ তহবিল থাকে, যার মাধ্যমে তাৎক্ষণিক খাদ্য বা আর্থিক সহায়তা প্রদান করা সম্ভব।(৩)আশ্রয়ণ প্রকল্প ও পুনর্বাসন: ভূমিহীন ও গৃহহীনদের জন্য ঘরের পাশাপাশি দুস্থদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থাও সরকারের রয়েছে।(৪) জাতীয় সমাজকল্যাণ পরিষদ: এই পরিষদের মাধ্যমে স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে অসহায় ব্যক্তিদের চিকিৎসার খরচ বা জীবনধারণের জন্য এককালীন অনুদান দেওয়া হয়।তবে সমস্যা কোথায়?তহবিল বা সরকারি নিয়ম থাকা সত্ত্বেও জিরোপয়েন্টের এই বৃদ্ধার মতো মানুষেরা কেন সুবিধা পাচ্ছেন না, তার পেছনে মূলত দুটি কারণ থাকে।তথ্যাদি ও সচেতনতার অভাব: অনেক সময় এই ধরনের বৃদ্ধ মানুষের কোনো জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) থাকে না বা তা হারিয়ে যায়। তাছাড়া কীভাবে আবেদন করতে হবে, কার কাছে যেতে হবে, তা তাদের জানা থাকে না। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের নজরদারির অভাব: স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর বা সমাজসেবা কর্মকর্তাদের সরাসরি তদারকি না থাকলে অনেক প্রকৃত অভাবী মানুষ এই সরকারি তালিকা থেকে বাদ পড়ে যান।তার জন্য আমরা কী করতে পারি?সাহেববাজার জিরোপয়েন্টের এই চিরচেনা মুখটির কষ্টের স্থায়ী অবসান ঘটাতে নাগরিক সমাজ এবং প্রশাসন যৌথভাবে এগিয়ে আসতে পারে ​(১) প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ড কাউন্সিলর অথবা জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের এই বৃদ্ধার বিষয়ে সরাসরি অবহিত করা যেতে পারে। তারা চাইলে তাৎক্ষণিকভাবে তাকে 'বয়স্ক ভাতা' বা 'বিশেষ দুস্থ কার্ড'-এর আওতায় নিয়ে আসতে পারেন।(২)স্থানীয় তরুণ ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন: রাজশাহীতে অনেক সক্রিয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন রয়েছে। তারা এই বৃদ্ধার স্থায়ী থাকার জায়গা বা নিয়মিত খাবারের ব্যবস্থা করার জন্য ছোটখাটো তহবিল গঠন করতে পারে।(৩)ব্যক্তিগত উদ্যোগ: আমরা যারা নিয়মিত ওই রাস্তা দিয়ে যাতায়াত করি, তারা কেবল এড়িয়ে না গিয়ে তার সাথে কথা বলে তার আসল সমস্যা (যেমন: পরিবার আছে কি না, রাতে কোথায় থাকেন) জানার চেষ্টা করতে পারি এবং সামর্থ্য অনুযায়ী শুকনো খাবার বা জরুরি ওষুধ কিনে দিতে পারি।জিরোপয়েন্টের এই বৃদ্ধা কেবল একজন ব্যক্তি নন, তিনি আমাদের সমাজের একাংশের অসহায়ত্বের প্রতীক। বোরখায় ঢাকা তার আত্মসম্মানবোধ যেন আমাদের বিবেকের কাছে পরাজিত না হয়। আসুন, যার যার অবস্থান থেকে এই অসহায় মায়ের পাশে দাঁড়াই এবং তার একটি স্থায়ী পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে প্রশাসনকে উদ্বুদ্ধ করি। এ সময় উপস্থিত ছিলেন প্রেস ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকবৃন্দরা ও প্রমুখ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ